উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা: চড়ছে উৎকণ্ঠার পারদ

313

আমিরুল আলম খান:

আর এক দিন পরেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। এবার ১৩ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেবে। তাই এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সহযোগী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের ঘুম হারাম। কারণ, এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার সব বিষয়ের প্রশ্নপত্র আগাম ঘোষণা দিয়ে ফাঁস করেছে দুর্বৃত্তরা, নতুবা ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল, তারা পরীক্ষার কেলেঙ্কারি কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। পরীক্ষা বাতিল হবে, নাকি বহাল থাকবে, সে সিদ্ধান্তও তারা নিতে পারেনি আজও। তবে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, আখেরে ক্ষতি হবে অপাপবিদ্ধ কিশোর পরীক্ষার্থীদের। দোষ বা ব্যর্থতা সরকারের, কিন্তু শাস্তি পাবে নির্দোষ ২২ লাখ পরীক্ষার্থী, এমন অবিচার কোনো কালে কোনো দেশে হয়েছে বলে মনে হয় না। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতি উৎসাহী কিছু আমলার স্বেচ্ছাচারিতার জন্যই এই দুর্যোগ, দুর্ভোগ। কিন্তু তাদের কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো লক্ষণই দৃশ্যমান নয়। বরং তাদের রক্ষায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ, আয়োজনে সমগ্র জাতি একই সঙ্গে হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। নিদেনপক্ষে একই প্রশ্নপত্রে সবার পরীক্ষা নেওয়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে যেসব কর্মকর্তা জাতির এত বড় ক্ষতি করল, চক্ষুলজ্জার খাতিরে হলেও তাদের বদলি করা উচিত ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তার শিকড় হাফ দশক পেরিয়ে এমন করে গেড়ে বসেছে, যে তাদের চাকরিজীবন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে নড়নচড়ন হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এদিকে নিরপরাধ প্রায় দেড় শ পরীক্ষার্থী কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে মাথা কুটে মরছে; যদিও দেশে প্রচলিত আইনে ১৮ বছরের নিচে কোনো শিশুর বিরুদ্ধে এমন নির্দয় ব্যবস্থা শিশু অধিকারপরিপন্থী। এত বড় ভুল সিদ্ধান্ত যাঁরা নিতে পারেন, তাঁরা শুধু বহাল তবিয়তেই আছেন তা নয়, বরং তাঁদের গলার জোর আরও বেড়েছে। উচ্চমাধ্যমিকেও নাকি অভিন্ন প্রশ্নতত্ত্ব বহাল থাকবে, যদিও একাধিক সেট প্রশ্ন ছাপা হয়েছে।

বাংলাদেশে অতিকথন মন্ত্রী-আমলাদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। দুনিয়ার কোনো দেশে আমলারা মিডিয়ায় মুখ খুলতে পারেন না। আমাদের দেশে আমলারা মিডিয়া গুলজার করে রাখেন। আর রাজনীতিকেরা কখন কী বলেন, কী তার অর্থ, তা আমজনতার বোধের বাইরে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ ও সার্টিফিকেশনের দায়িত্ব শিক্ষা বোর্ডের। ১৯৬১ সালের অরডিন্যান্সে তা-ই বলা আছে (মনে রাখতে হবে, সেখানে জুনিয়র সার্টিফিকেট বা জেএসসি পরীক্ষা গ্রহণের কোনো কথা বলা নেই। এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ বেআইনি)। গণতান্ত্রিক সরকার সে অধিকার বোর্ডের কাছ থেকে কোনো আইন বলে ছিনিয়ে নিলেন, তা জাতি জানতে পারেনি। এখন কোনো বোর্ডে পরীক্ষার্থী সংখ্যা কত, পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা কত, তা সাংবাদিক ডেকে বলার মালিক বনেছেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী! মন্ত্রণালয় নিজের কাজ না করে শিক্ষা বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের দায়িত্ব কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সারা দুনিয়ায় মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো, নীতিনির্ধারণ ও তদারকি করে যার কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া। আমাদের দেশ চলে অদ্ভুত উটের পিঠে সওয়ার হয়ে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুন ক্ষোভের সঙ্গে মন্তব্য করেছেন, যার কাজ তাকেই করতে দেওয়া উচিত।

জাতি শুনে কতটুকু আশ্বস্ত বোধ করছে তা জানি না। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিক ডেকে এলান করে দিলেন, এবার কয় সেট প্রশ্ন ছাপা হয়েছে, কীভাবে কোথায় প্রশ্ন পাঠানো হবে, পরীক্ষার কত মিনিট আগে কেমন লটারি করে কোন সেটে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত ফিরিস্তি! প্রথমত, এসব কথা বলার কাজ মন্ত্রীর নয়; দ্বিতীয়ত, কর্মপদ্ধতির গোপনীয়তা রক্ষা করতে মন্ত্রী শপথবদ্ধ। তিনি যত কম কথা বলবেন, ততই মঙ্গল। তবে তিনি সবচেয়ে জব্বর খবরটা জানিয়ে দেশবাসীকে ধন্য করেছেন। তিনি জানালেন, কোচিং সেন্টার বেআইনি; কিন্তু তা বন্ধ করার তাকত তাঁর নেই। ওদিকে তাঁর ঘোষণা শেষ না হতেই কোচিং ব্যবসায়ীদের সংগঠনের প‌ক্ষে এক টিভি চ্যানেলে হুংকার দিয়ে বলা হলো, কোচিং সেন্টার সম্পূর্ণ আইনি এবং তাঁরা সিটি করপোরেশন থেকে ’কোচিং ব্যবসা’র নামেই লাইসেন্স নিয়ে বৈধভাবে এ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। আর ব্যান্ডেন্ড কোচিং সেন্টারগুলো নাকি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত। সরকার তাদের কাছ থেকে নিয়মিত ট্যাক্স, ভ্যাট আদায় করে। যদি কোচিং ব্যবসা বেআইনি হবে, তাহলে সরকার তাদের কাছ থেকে ট্যাক্স, ভ্যাট আদায় করে কোনো আইনে? বোঝা যাচ্ছে, শাসকগোষ্ঠীর কথায় এবং কাজে কোনো মিল নেই, বরং সেখানে বহুত ফারাক। কোচিং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের দহরম-মহরম কোনো পর্যায়ের, তা কিছুটা এবার জানা গেল বটে।

পরীক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাফল্য প্রায় শূন্য। বরং গোয়েন্দা পুলিশ ও দুদকের অনুসন্ধানকে অধিক বাস্তবোচিত বলে গণ্য করা যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যখন মন্ত্রী জানাচ্ছিলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে তিনি কতটুকু সমর্থ হবেন, তা একমাত্র খোদা জানেন, তখন সেখান থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলছিলেন, দেশ ডিজিটাল হলেও যেখানে প্রশ্নপত্র ছাপা হয়, সেই বিজি প্রেস অ্যানালগ। তিনি বিজি প্রেস সরেজমিনে দেখে বুঝেছেন, সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির লেশমাত্র নেই এবং বিজি প্রেস এখন আর গোপনীয় কাজ করার জন্য আদৌ উপযুক্ত নয়। আমরা এই পুলিশ কর্মকর্তার মন্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিতে সরকারকে অনুরোধ করব।

এদিকে মন্ত্রীর একই কথা, প্রশ্নফাঁসের আসল ও একমাত্র ক্রিমিনাল নাকি শিক্ষকেরা। কিন্তু গোয়েন্দারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের অনুসন্ধানে অপরাধীর তালিকায় কিছু শিক্ষক থাকলেও সরকারের কিছু অসাধু কর্মকর্তা যে নেই, তাও হলফ করে বলা যাবে না। আরও অনেক স্বার্থবাদী গোষ্ঠী এতে জড়িয়ে গেছে, যারা দেশের অভ্যন্তর ভাগের মতোই দেশের বাইরেও তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে থাকতে পারে, যারা সাইবার ক্রাইমে অনেক বেশি পারদর্শী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘ্যানর ঘ্যানর থেকে গোয়েন্দাদের দৃষ্টি সমস্যার অনেক গভীরে প্রসারিত বলেই নাগরিকদের বিশ্বাস।

শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের হুংকার গর্জনে কোনো ঘাটতি আছে—এমন নিন্দা কোনো দুর্মুখও বোধ হয় করবে না। কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই কেন হালে পানি পাচ্ছে না, সেটা গবেষণার বিষয় বটে। তা নিয়ে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই নয়, সরকারের সব যন্ত্র সক্রিয় বলেই মনে হচ্ছে। তবে এটাও লক্ষণীয়, আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব আছে প্রচুর, যার ফাঁক দিয়ে দুর্বৃত্তরা বেরিয়ে যাচ্ছে আর মার খাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ ও তাদের সন্তানেরা।

আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বপ্রাজ্ঞ আর সর্বকাজে দক্ষ লোকবলে টইটম্বুর। তাই তাঁরা যত কাজ করেন, ঢোল বাজান তার চেয়ে ঢের বেশি। সেখানকার মহাপ্রাজ্ঞরা অহর্নিশ জাতিকে নসিহত করেই চলেছেন এবার পরীক্ষায় তারা কী কী জাদুর খেল দেখাবেন। কিন্তু আমজনতার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছেই। মাধ্যমিক পরীক্ষার মতোই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও প্রহসনে পরিণত হবে না তো? যদি তা হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ১৩ লাখ তরুণ, যারা আমাদের সোনালি ভবিষ্যৎ রচনার আসল কারিগর হওয়ার কথা।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরীক্ষাব্যবস্থায় তাদের নতুন চমক হলো পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণি শেষে যথাক্রমে প্রাথমিক সমাপনী ও জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা চালু করা। যাঁরা এই দুটি পরীক্ষার পাহাড় আমাদের কোমলমতী শিশুদের ঘাড়ে চাপিয়েছেন, তাঁরা এর কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি দেখাতে পারেননি, যদিও অনেক মানুষ এই দুই পরীক্ষার বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাতে অবশ্য কর্তাদের জেদ আরও বেড়েছে। আর শিশুদের কাঁধ থেকে পরীক্ষা-দানবও নামেনি।

ষোলো কোটি মানুষের বাস যে দেশে, সেখানে একটি পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ মহাযজ্ঞই বটে। তবে সেটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে, যখন শাসকগোষ্ঠীর ন্যূনতম সততাও নির্বাসিত হয়, সুশাসন বনবাসে যায়।

আমিরুল আলম খান: যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান।
amirulkhan7@gmail.com