উত্তর-কোরিয়ার ইতিহাস ও বহিঃ সম্পর্ক

358

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে, ১৯১০ সাল থেকে আধিপত্য বিস্তার করা জাপান অভিক্ত কোরিয়ার শাসনভার হারায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানী সাম্রাজ্যের আত্মসমর্পণের পর ৩৮তম উত্তর প্যারালেল বা ৩৮°উত্তর অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়ার বিভাজন পরিচালিত হয়। মিত্রশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশ দুটিকে একত্র করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়,   ফলে ১৯৪৮ সালে দুটি পৃথক সরকার প্রতিষ্ঠা করে – সোভিয়েত-সমর্থিত উত্তর কোরিয়া এবং পশ্চিমা-সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়া । সৃষ্টি হয় দুই রাষ্ট্রের। উত্তর  কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া। মার্কিন সামরিক  বাহিনী বিভক্ত কোরিয়ার দক্ষিন ভাগ তাদের দখলে আনে এবং সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনী উত্তর অর্ধেক অধিকারে আনে।

সোভিয়েত অধীষ্ঠিত উত্তর ভাগে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্যবাদ এবং দক্ষিণ ভাগে আমেরিকা গড়ে তোলে পুঁজিবাদী। এ যেন একটি অখন্ড দ্বীপকে রাজনৈতিক  মতাদর্শে বিভক্ত করা।

আমেরিকার হস্তক্ষেপে ৩৮°উত্তর অক্ষরেখা রেখা অনুযায়ী কোরিয় দ্বীপের অধিক ভাগ পড়ে দক্ষিণ কোরিয়ায়। এতে করে উত্তর কোরিয়ার মধ্যে এক ধরনের ক্ষোপের সৃষ্টি হয়।

২৫ জুন, ১৯৫০ ভোর সাড়ে চারটায় দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশে উড়তে থাকে উত্তর কোরিয়ার বিমান। চেপে থাকা কষ্ট তখন রূপ নেয় যুদ্ধে। অতর্কিত আক্রমনে দিশাহারা হয়ে পরে দক্ষিণ কোরিয়া ।  শুরু হয় কাটা তারে বিভক্ত হওয়া একটি দ্বীপের দুটি রাষ্টের মধ্যে যুদ্ধ।

এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে আন্তর্জাতিক তিন লাখ একচল্লিশ সৈন্যের ৮৮ শতাংশই মার্কিনিরা প্রদান করে। এতে করে আমেরিকার প্রতি উত্তর কোরিয়ার ক্ষোপ আরও বেড়ে যায়। তখন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্য যুদ্ধে যোগ দান করে (সমাজত্রান্ত্রিক) গণপ্রজাতন্ত্রী চীন । সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউনিয়ন নানা জটিলতার কারণে তখন যুদ্ধে যোগ দান করতে না পারলেই চীন ও উত্তর করিয়াকে সকল প্রকার সরঞ্জামিক সহয়তা প্রদান করে। টানা ৩ বছর ধরে ঘটিত এই ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটে ২৭ জুলাই ১৯৫৩ সালে  কোরীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে।  এই যুদ্ধে ২৫ লাখের উপরে বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়।

কিম ইল-সাং বিভক্ত উত্তর কোরিয়াকে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭২ সাল এবং ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল ,তার  মৃত্যুর আগ পর্যন্ত,  নেতৃত্ব দেন । তিনি এমন শাষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলে যেখানে জনগন তাদের শাষকদের অন্ধভাবে শ্রদ্ধা করতে থাকে। তিনি স্বনির্মিত “জুচে” (আত্মনির্ভরতা) নীতি অনুসারে স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করেন। তবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ঐক্যের পতনের ফলে অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয় ও উত্তর কোরিয়ার দুর্ভিক্ষ এর সূচনা ঘটে। । কিম ইল-সাং এর মৃত্যুর পর তার পুত্র কিম জং-ইল(তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির মহাসচিব ছিলেন) ক্ষমতাগ্রহণ করেন। কিম জং ইলের রাজ্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর তিনি ২৮ ডিসেম্বর ২০১১ তার সরব কনিষ্ঠ প্ত্র কিম-জং-উং  নিজেকে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। ।   কিম জং-উন হচ্ছেন বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রথম সম্পাদক, উত্তর কোরিয়ার কেন্দ্রীয় সামরিক সংস্থার সভাপতি, উত্তর কোরিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা সংস্থার সভাপতি, কোরিয়ান পিপলস আর্মির সর্বোচ্চ অধিনায়ক ও কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতিমণ্ডলীয় নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য।

শাষক পরিবর্তন হলেও পুর্বের ইতিহাসের রেশ ধরেই আমেরিকার উপর  উত্তর কোরিয়ার ক্ষোপ রয়েই গেছে।

এই রাগ,ক্ষোপ নিরসনের কারনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম-জং-উন বৈঠকে বসতে বার বার ব্যর্থ হন। অবশেষে নানা জল্পনা কাটিয়ে কিম ট্রাম্পকে স্বভাববিরোধি এক বন্ধুসূলভ বার্তা পাঠান। ২০১৮ সালের ১২ই জুন দুই দেশের নেতা প্রথমবারের মত সিঙ্গাপুরে মিলিত হন । সম্মেলন জুড়ে একাধিক আলোচনায় একত্রিত হন এবং নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা ও স্থায়ী শান্তির জন্য যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ৷

পুনরায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে দ্বিতীয় সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামে, কিন্তু সম্মেলনটি কোন সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।

আসাদ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ