সম্পর্ক

287

শীতের সন্ধ্যা , চারদিকে কুয়াশার কিছুটা আনাগোনা দেখা যাচ্ছে । কুয়াশা ভেদ করে চিলতে পরিমান জোছনা এসে পড়ছে প্রকৃতির গায়ে । চারিদিকে জোছনা আর কুয়াশার এক অদ্ভত মিলন মেলা । দু-একটা পাখির কিচির মিচির যা  শোনা যাচ্ছিলো তাও  এখন আর শোনা যাচ্ছে না । সবাই তখন নীড়ে ফেরার পথে। পাশের টং ঘর থেকে ভেসে আসছে চা বানানোর টুং টাং শব্দ । চা বানাচ্ছেন বরাত মামা । দোকানের সামনে বসা কুচচে জড়সর হয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধা ।

 ভার্সিটি বাস মিস করে, লোকাল বাসের অপেক্ষায় আমি আর তিথী দাঁড়িয়ে আছি ভার্সিটির মেইন গেইটে,  কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে। আমার গায়ে গাড় খয়েরী পাঞ্জাবি উপরে কালো চাদর আর তিথীর পড়নে লাল শাড়ি ।

 

মাথার উপর কখন যেন এসে পড়ছে  লাল রঙের কৃষ্ণচূড়া ।

তিথী উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলো ­- রুদ্র দাড়াও নড়ো না ।

“ও আজকাল আমাকে রুদ্র বলে ডাকতে শুরু করেছে । ওই দু একটা কবিতা টবিতা  লিখি বলে ।“

খুব অল্প কিছুতে বিস্মিত হয় তিথী । ওকে অবাক করতে খুব দামি জিনিসের  প্রয়োজন পড়ে না। মাটির তৈরী একটা ছোট্র ঘর বা দু একটা লাল গোলাপ ।

 

আমি একটু অবাক হয়েই বললাম – কি?

– তোমার মাথার উপরে কৃষ্ণচূড়া  , জোছনার আলোতে অনেক সুন্দর লাগছে ।

আমি না নড়ে তাকিয়ে  রইলাম ওর চোখের দিকে  । ও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই কৃষ্ণচূড়ার দিকে ।

কি সরলতা ওর তাকানোতে । মনে হয় সৃষ্টি কর্তা সব মায়া ,মমতা ,সরলতা ওর ঔ চোখে দিয়েছেন।

হুট করেই ভ্রম ভাঙ্গাতে বেজে উঠলো বাসের কর্কশ হর্ণ ।দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠলাম দুজন । বাস ভর্তি মানুষ। দাঁড়ানোর জায়গা অব্দি নেই । কিছু করার নেই এর মধ্যেই যেতে হবে । এর পরে যে কনো বাস পাবো তার নিশ্চয়তাও নেই । উপরের রড ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর আমার পাঞ্জাবির শক্ত করে  টেনে ধরে আছে তিথী ।একটু দুরে যেতেই  দুজন “থামও” বলে ছিট ছেরে নেমে গেলো । হুড়মুড় করে বসে পড়লাম  তিথী আর আমি, পাশাপাশি । তারপর শুরু হাসা হাসি ।এমন ভাবে ও হয়ত কখনো বাসে উঠে নি । হাসির শব্দে পুরো বাসের মানুষ সজাগ । বাকা চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে ।

বাসে আলো তখন নিভানো । অন্ধকার থেকে কে একজন গম্ভীর সুরে  বলে উঠলো – একটু আস্তে হাসুন ।

কথা শুনে আরো হাসি বেড়ে গেলো তিথীর । এবার মুখে হাত দিয়ে চাপা কন্ঠে হাসছে ।

এভাবেই বাস চলে গেছে বহুদূর । আরো অন্ধকার হচ্ছে যেনো চারপাশ । ও বসেছে জানালার দিকটায় । জানালার ফাকা একটু জায়গা দিয়ে হাল্কা ঠান্ডা বাতাসে কয়েকটি চুল উড়ে উড়ে এসে  বার বার পড়ছে আমার মুখে । আর ও আনমনে  তাকিয়ে আছে বিস্তৃত আকশের দিকে । আর আমাকে বার বার ডেকে দেখাচ্ছে  জোছনার মাধুর্য ।

মিনিট কয়েক পরে কনক্ট্রাকর মামা আমাদের হুংকার দিয়ে  বললেন , হস্পিটাল মোড় ,হস্পিটাল মোড় ।

গন্তব্যে নেমে গেলাম আমরা দুজন । আমাদের হাতে তখন কিছু সময় বাকি । এশার আজানের পড় তিথীর মেসের তালা বন্ধ হবে । কেউ তখন ভিতরে  ঢূকুতে নানান প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয় । মেসের মালিক খুব কড়া ।

মসজীদের মোয়াজ্জীন তখন  পাগড়ী ঠিক করতে করতে এগুচ্ছেন মসজীদের দিকে । হাতে খূব বেশী সময় নেই । আশে পাশে খুব বেশী রিক্সাও নেই । দ্রুত পায়ে হাটতে লাগলাম আমরা । একটু যেতেই দেখি রিক্সার হুডি টেনে  গা এলিয়ে   আপন মনে বিড়ি টানছেন এক মামা ।

এগিয়ে গিয়ে বললাম – যাবেন?

বিড়ি টানতে টানতেই জিজ্ঞাসা করলেন – কই?

সারাদিনে হয়ত তার ভালোই রোজকার হয়েছে তাই এখন ভাড়া টানবার তেমন ইচ্ছাও নেই ।

 

– বাবর আলী গেট ।

– হূ  যাবো । তবে ভাড়া ৪০ টাকা । পাশ থেকে একা একটি লোক একনজরে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে ।

হাতে সময়ও নেই । তাই ২০ টাকার ভাড়া দিগুন দিয়ে চললাম বাবর আলী গেটের দিকে ।

শীতের আবেশে যেনো লাল হয়ে যাচ্ছে তিথীর সাদা হাত । আমার চাদর জড়িয়ে দিলাম ওর গায়ে ।

-আরে তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে তো !

– আমি মজা করে বললাম , কালোদের শীত লাগে না ।

 

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ঠেকে আর দূরে সরে যেতে লাগলাম আমরা ।

তার ভুলো মন কি ভাবছে আমরা  প্রেমিক প্রেমিকা ! দূরে চলে এসেছি , অনেকটা দূর ।

তার দৃষ্টি সীমা তার ভাবনার অনেক দূরে ।